কুরআন বারবার মানুষকে আহ্বান করেছে আসমান-জমিন ও আল্লাহর সৃষ্টির দিকে গভীরভাবে চিন্তা-গবেষণা করতে। কারণ সৃষ্টি নিয়ে গবেষণা মানুষকে স্রষ্টার একত্ব, শক্তি, জ্ঞান ও উদ্দেশ্য বুঝতে সাহায্য করে।
মানব ইতিহাসে জ্ঞান অন্বেষণের দুটি প্রধান উৎস চিহ্নিত করা যায়। একটি ঐশী ওহী, অপরটি প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ। চিন্তাশীলদের দৃষ্টিতে এই দুটি উৎস পরস্পরবিরোধী নয়, বরং একে অপরের পরিপূরক। কুরআনের ৫:৩১ নং আয়াতে বর্ণিত ঘটনা এই সত্যের একটি চমৎকার দৃষ্টান্ত, যেখানে আল্লাহ একটি সাধারণ কাকের মাধ্যমে মানুষকে এমন এক শিক্ষা দিয়েছেন, যা মানুষ নিজে আবিষ্কার করতে পারেনি।
জ্ঞানীদের চিন্তার ঐতিহ্যে দুটি কিতাবের ধারণা প্রচলিত। একটি লিখিত কিতাব, অন্যটি উন্মুক্ত ও দৃশ্যমান কিতাব। প্রথমটি কুরআন, আর দ্বিতীয়টি সমগ্র সৃষ্টিজগৎ। এই দর্শনের ভিত্তি কুরআনেই নিহিত।
লক্ষণীয় বিষয় হলো, "আয়াত" শব্দটি কুরআনে দ্বৈত অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এটি কুরআনের বাক্যকেও বোঝায়, আবার সৃষ্টিজগতের নিদর্শনকেও নির্দেশ করে। এই ভাষাগত সংযোগ থেকেই স্পষ্ট হয় যে, কুরআনিক ভাষায় 'আয়াত' শুধু লিখিত বাণীর একক নয়; সৃষ্টিজগতের পর্যবেক্ষণযোগ্য নিদর্শনও 'আয়াত' হিসেবে উল্লেখিত হয়। ফলে কুরআনিক জ্ঞানচিন্তায় প্রকৃতির নিদর্শন, উপলব্ধি ও চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
৫:৩১ নং আয়াতে বর্ণিত ঘটনাটি এই ধারণাকে বাস্তবে রূপ দেয়। একজন কর্তৃক অপরজন নিহত হওয়ার পর ঘাতক যখন হতবিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, তখন আল্লাহ একটি কাক পাঠালেন, যা মাটি খুঁড়ে দেখাল কীভাবে মৃতদেহ আড়াল করতে হয়। এখানে লক্ষণীয়, এই জ্ঞান মানুষের কাছে কোনো নবী, কোনো ঐশী গ্রন্থ বা কোনো মানবীয় শিক্ষকের মাধ্যমে আসেনি। এসেছে একটি সাধারণ পাখির প্রাকৃতিক আচরণ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, আল্লাহ তাঁর সৃষ্টিজগতের প্রতিটি স্তরে, এমনকি সবচেয়ে সাধারণ প্রাণীর আচরণেও, প্রজ্ঞা ও শিক্ষা ছড়িয়ে রেখেছেন। যা মানুষের পর্যবেক্ষণ ও চিন্তাশক্তির অপেক্ষায় থাকে।
অনেক সময় মানুষ সৃষ্টির রহস্যকে না বুঝে ধর্মীয় গল্প, পৌরাণিক কাহিনী বা অনুমান দিয়ে ভরাট করে। কুরআন মানুষকে বাস্তব গবেষণার দিকে ঠেলে দেয়, অন্ধভাবে কল্পিত কাহিনী বা কুসংস্কার মেনে নেওয়ার দিকে নয়। ৮৮:১৭-২০ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন, মানুষ যেন লক্ষ্য করে উট কীভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে, আকাশ কীভাবে উঁচু করা হয়েছে, পাহাড় কীভাবে স্থাপন করা হয়েছে, এবং পৃথিবী কীভাবে বিস্তৃত করা হয়েছে। এই আয়াতগুলো নিছক বর্ণনা নয়, বরং একটি পদ্ধতিগত আহ্বান। "পর্যবেক্ষণ করো, চিন্তা করো, উপলব্ধি করো।" এই আহ্বানের ধারাবাহিকতাতেই আজকের গ্রহের গতিপথ পর্যবেক্ষণ বা মানবদেহের গঠন অধ্যয়নের মতো বৈজ্ঞানিক যাত্রা সম্ভব হয়েছে। প্রকৃতিকে পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা যায় সৃষ্টির ভেতরে নিয়ম ও উদ্দেশ্য রয়েছে। আর এভাবেই কুসংস্কার ও মনগড়া ব্যাখ্যা থেকে মুক্ত হয়ে মানুষ সত্যকে উপলব্ধি করে।
সৃষ্টি নিয়ে এই গবেষণা প্রধানত ৪টি কারণে গুরুত্বপূর্ণ:
তবে এই দুই কিতাবের কার্যপদ্ধতি ভিন্ন। সৃষ্টিজগতের পর্যবেক্ষণ থেকে মানুষ প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া, নিয়ম ও কার্যকারণ সম্পর্কে জ্ঞান অনুসন্ধান করে। এটি এমন এক কিতাব, যা ডিকোড করতে হয়, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হয়, বারবার পর্যবেক্ষণ করে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হয়। বিজ্ঞান মূলত এই উন্মুক্ত কিতাবেরই পাঠ। অন্যদিকে কুরআন মানুষের উদ্দেশ্য, নৈতিকতা, জবাবদিহিতা ও জীবনপথ সম্পর্কে দিকনির্দেশনা দেয়। এটি মানুষকে বলে দেয় কোন পথে চললে কল্যাণ, আর কোন পথে বিপথগামিতা ও ধ্বংস। ফলে দুটির জ্ঞানগত ভূমিকা এক নয়, যদিও তারা পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। কাকের ঘটনায় যেমন দেখা যায়, কখনো কখনো এই দুই কিতাব একে অপরের সাথে সংযুক্ত হয়, যেখানে প্রকৃতির একটি দৃশ্য সরাসরি নৈতিক ও আধ্যাত্মিক শিক্ষায় রূপান্তরিত হয়।
মহাবিশ্বের সুশৃঙ্খল গঠন এই সংযোগের আরেকটি দৃষ্টান্ত।
সূর্য-চন্দ্রের নির্দিষ্ট কক্ষপথ ও দিন-রাতের অবিচল আবর্তন মানুষ যুগে যুগে পর্যবেক্ষণ করে ক্যালেন্ডার তৈরি করেছে, কৃষিকাজে সময় নির্ধারণ করেছে, সময়ের ধারণা গড়ে তুলেছে। এই সুনির্দিষ্ট নিয়মানুবর্তিতা মানুষের সামনে এক মহাপরিকল্পনার সাক্ষ্য বহন করে।
পৃথিবীর সম্পদ, খনিজ, উদ্ভিদ, প্রাণী সবকিছুই গবেষণার মাধ্যমে বোঝা ও কাজে লাগানো যায়, আর এভাবেই সৃষ্টি নিয়ে অনুসন্ধান মানবকল্যাণের পথ খুলে দেয়।
সৃষ্টিজগৎকে একটি উন্মুক্ত কিতাব হিসেবে দেখার এই দৃষ্টিভঙ্গি জ্ঞান অন্বেষণকে কোনো সংকীর্ণ সীমানায় আটকে রাখে না, বরং চিন্তার রাজ্যকে বিস্তৃত করে। প্রতিটি নতুন আবিষ্কার, বৈজ্ঞানিক নীতি ও প্রকৃতির প্রতিটি নিয়ম এসবই সেই মহাগ্রন্থের এক একটি পাতা, যা সৃষ্টিকর্তা মানুষের সামনে উন্মুক্ত করে রেখেছেন। মানুষের কাছে কাক যেমন এক নীরব শিক্ষক হয়ে উঠেছিল, তেমনি সমগ্র সৃষ্টিজগৎ আজও মানুষের জন্য গভীর পর্যবেক্ষণ ও উপলব্ধির অপেক্ষায় রয়েছে।