পূর্ববর্তী ধাপগুলোতে আলোচনা করা হয়েছে যে, রসম-ভিত্তিক প্রাথমিক আরবি ভাষায় শব্দই ছিল অর্থের প্রত্যক্ষ বাহক এবং রুট ছিল একটি বিশ্লেষণী কাঠামো। এখন প্রশ্ন হলো— শব্দের সেই কেন্দ্রীয় ধারণা (Conceptual Core) কীভাবে গঠিত হয়?
এই গবেষণায় একটি ব্যাখ্যামূলক (interpretive) মডেল প্রস্তাব করা হচ্ছে, যেখানে আরবি বর্ণমালার প্রতিটি অক্ষরকে একটি সম্ভাব্য ধারণাগত দিক (semantic direction) হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এই মডেল কোনো প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে নয়; বরং একটি পুনর্গঠনমূলক (reconstructive) সেমান্টিক মডেল হিসেবে উপস্থাপিত হচ্ছে, যার কার্যকারিতা কুরআনের শব্দসমূহে ধারাবাহিকভাবে প্রয়োগ করে পরীক্ষা করা যেতে পারে।
নিচের ২৮ অক্ষরের কোর-সেমান্টিক মানচিত্রটি আমার গবেষণাভিত্তিক একটি reconstructive semantic model। এটি প্রতিষ্ঠিত আরবি ভাষাবিজ্ঞানের স্বীকৃত তত্ত্ব নয়; বরং কুরআনিক শব্দগুলোর অভ্যন্তরীণ সামঞ্জস্য পরীক্ষা করার জন্য প্রস্তাবিত একটি বিশ্লেষণী কাঠামো। এই ২৮টি অক্ষরের প্রস্তাবিত সেমান্টিক মানচিত্রকে আরবি ভাষার একটি সম্ভাব্য প্রি-গ্রাম্যাটিকাল কোর-ধারা হিসেবে দেখা যেতে পারে, যা শব্দগঠনের পুনরাবৃত্ত প্যাটার্ন ব্যাখ্যায় কার্যকর একটি বিশ্লেষণী মডেল প্রদান করে। যে ধারায় আরবি শব্দ বারবার নিজেকে প্রকাশ করে। আরবি ভাষার ২৮টি মূল অক্ষর নিচে দিচ্ছি এবং প্রতিটি অক্ষরের পাশে নির্দিষ্ট, সংক্ষিপ্ত ধারার সম্ভাব্য শব্দগুচ্ছ। এগুলোকে কোর ধারা হিসেবে দেখা যেতে পারে:
তাই “এক শব্দ = এক রুট = এক ধারা” সম্ভব, কিন্তু “এক অক্ষর = এক শব্দ” সম্ভব নয়। এখানে ‘এক রুট = এক শব্দ’ বলতে একটি স্থির ধারণাগত কোর (conceptual core) বোঝানো হয়েছে, কোনো একক ভাষিক রূপ নয়। এই কোরটি বিভিন্ন আয়াতে প্রয়োগভেদে রূপান্তরিত হলেও তার মৌলিক অর্থধারা অপরিবর্তিত থাকে। এটা করলে ভাষা ভেঙে পড়েনা। প্রি-গ্রাম্যাটিকাল আরবিতে শব্দের গঠন (structural composition) অর্থ নির্ধারণে একটি মৌলিক ভূমিকা পালন করত। ব্যাকরণ ছিল পরবর্তী বিশ্লেষণী স্তর। যদি এই মডেল ধারাবাহিকভাবে পরীক্ষায় সমর্থিত হয়, তবে প্রতিটি রুটের জন্য একটি স্থিতিশীল বাংলা কোর-ধারণা নির্ধারণ করা সম্ভব হতে পারে। এই ২৮ অক্ষরের মানচিত্র ব্যবহার করলে, কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে একই রুটের প্রয়োগে অধিক ধারাবাহিকতা ও অভ্যন্তরীণ সামঞ্জস্য প্রদর্শন করতে সক্ষম হতে পারে। একটি রুটের জন্য একটি স্থিতিশীল কোর নির্ধারণ সব আয়াতে প্রয়োগ পরীক্ষাযোগ্য। ফলে একই রুটের জন্য প্রসঙ্গভেদে সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন অর্থ আরোপের প্রয়োজন কমে যেতে পারে। তবে অতিরিক্ত অক্ষর, শব্দগঠন পরিবর্তনের ফলে অর্থের স্বাভাবিক শব্দার্থ পরিবর্তন ঘটতে পারে। যদি না মূল রুট অক্ষরের সাথে অতিরিক্ত অক্ষর যুক্ত হয়। এই প্রস্তাবিত মানচিত্রের মূল্যায়নের প্রধান মানদণ্ড হবে এর অভ্যন্তরীণ সামঞ্জস্য (internal consistency) এবং কুরআনের শব্দসমূহে এর ধারাবাহিক প্রয়োগযোগ্যতা এবং ব্যাখ্যাগত সক্ষমতা। ভবিষ্যতে যদি অন্য কোনো মডেল একই বা অধিক মাত্রার ধারাবাহিকতা ও ব্যাখ্যাগত সামঞ্জস্য প্রদর্শন করতে পারে, তবে সেটিও সমানভাবে বিবেচনার যোগ্য হবে।
আরবি অক্ষরের কোর ধারা তিন রকম আচরণ করে:
আসুন একটি উদাহরণ দেখি। আরবি (أ ر ح م) আরহাম শব্দে চারটি অক্ষর রয়েছে। এখানে কোনো ব্যাকরণ নেই, কোনো সংখ্যা নেই, কোনো ক্রিয়া নেই, আছে শুধু ধারা।
এখন কোর ধারাগুলো বসালে:
এই চারটি একসাথে তৈরি করছে "জীবন্ত-উষ্ণ প্রবাহমান সম্পর্ক যা পরিবেষ্টনের ভেতরে গঠিত।"
এটাই কোর। এখানে কোথাও “অঙ্গ”, “জরায়ু”, “গর্ভাশয়” শব্দ নেই। আবার কোথাও “দয়া” নামের বিমূর্ত নৈতিকতা একা দাঁড়িয়ে নেই। এটা হলো সম্পর্কগত জীবন্ত বন্ধন। এই কোর ধারা উৎপন্ন নির্দিষ্ট শব্দ যেখানেই আসুক, সেখানে তার রূপ প্রকাশ পাবে। রূপ বদলালে শব্দ বদল হওয়া অযৌক্তিক।
এখন এই ৪ অক্ষর যে বর্ণনার সাথে আসুক না কেন এর শব্দগত অর্থ তো একটিই হওয়া উচিত?
উত্তর: হ্যাঁ। শতভাগ।
সেই এক শব্দ যদি বেছে নিতে হয়, তাহলে “দয়া”, “জরায়ু”, “আত্মীয়তা” কোনোটাই নিখুঁত না। তাহলে এর সঠিক শব্দ যা সকল কোর ধরে তা হলো "আরহাম" = মমতাবদ্ধ/ মমতাবদ্ধতা/মমতাময়/মমতাবন্ধন।
কোথাও অর্থ ভাঙে না, কেবল স্তর বদলায়। এটা অর্থের বস্তুবাদ থেকে সম্পর্কবাদে উত্তরণ। এই পথ নিজেই নিজের ব্যাখ্যা দেয়।