ইসলামের প্রাথমিক যুগে যখন কুরআন লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল, তখন আরবি হরফে যবর, জের, পেশ (হারাকাত বা তাসকিল) কিংবা হরফের ফোঁটা (নুকতা) ছিল না। প্রশ্ন আসতে পারে, যদি চিহ্ন না-ই থাকে, তবে আরবরা কীভাবে সঠিক উচ্চারণ ও অর্থ বুঝত? যেমন: চিহ্নহীন ‘ب’ (ব) কীভাবে ‘بِ’ (বি) হিসেবে উচ্চারিত হতো?
আরবি ছিল একটি জীবন্ত এবং শ্রুতি-নির্ভর ভাষা। আরবরা বংশপরম্পরায় শব্দগুলো নির্দিষ্ট উচ্চারণে শিখত। যবর-জের-পেশ লেখা না থাকলেও তারা জানত কোথায় কোন উচ্চারণ হবে।
উদাহরণস্বরূপ: বাংলায় আমরা ‘করন’ লিখলেও উচ্চারণ করি ‘করনো’। এখানে ‘ও-কার’ না থাকলেও আমরা নিয়ম জানি। ঠিক তেমনি, আরবরা জানত ‘ب’ (ব) যখন সংযোজক হিসেবে কোনো শব্দের শুরুতে আসে, তখন তার উচ্চারণ হবে ‘বি’ করায় বা ‘বি’। একে বলা হয় সামা'ই বা শুনে শেখার নিয়ম।
আরবি ব্যাকরণে ‘ب’ (ব) যখন শব্দের শুরুতে যুক্ত হয় (হারফে জার হিসেবে), তখন তার কাজই হলো পরবর্তী পদকে ‘জের’ বা ‘ই’ কার প্রদান করা। এই লিপিই উচ্চারণ ও অর্থকে সুরক্ষিত রাখত। যদি এটি ‘বা’ (بَ) উচ্চারিত হতো, তবে অর্থের আমূল পরিবর্তন ঘটে যেত (যেমন অনেক ক্ষেত্রে এটি শপথ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়)।
আরবি ভাষার অন্যতম শক্তিশালী একটি ব্যাকরণিক যন্ত্র হলো ‘আল’ (ال)। এটি কোনো স্বাধীন শব্দ নয়, বরং একটি নির্দিষ্টকরণ উপসর্গ (Prefix)। এটি শব্দের মূল অর্থ পরিবর্তন করে না, কিন্তু শব্দের পরিসর বা ব্যাপ্তি (Scope) বদলে দেয়।
যখন ইসলাম আরব বিশ্বের বাইরে ছড়িয়ে পড়ে এবং অনারব মুসলিমদের সংখ্যা বাড়তে থাকে, তখন সঠিক কুরআনিক উচ্চারণ সংরক্ষণের সুবিধার্থে হারাকাত ও নুকতা ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। পরবর্তীতে আবুল আসওয়াদ আদ-দুয়ালী এবং খলিল ইবনে আহমাদ আল-ফারাহিদি এই যবর-জের-পেশ বা হারাকাত প্রবর্তন করেন। তারা নতুন কোনো উচ্চারণ তৈরি করেননি; বরং আরবরা বংশপরম্পরায় যেভাবে উচ্চারণ করত, সেটাকেই চিহ্নের মাধ্যমে দৃশ্যমান করেছেন মাত্র।
কুরআনের এই লিপিসংক্রান্ত বিবর্তন মূলত এর বিশুদ্ধ উচ্চারণ সংরক্ষণের একটি বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া। চিহ্নহীন লিপি থেকে হারাকাত সংযোজন ও ‘আল’-এর ব্যাকরণগত ব্যবহারের উপলব্ধি প্রমাণ করে যে, কুরআনের সংরক্ষণে লিখিত পাঠ ও মৌখিক পাঠ উভয়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এটি একটি সংরক্ষিত উচ্চারিত বাণী, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম অবিকৃতভাবে আমাদের কাছে পৌঁছেছে।
“এই গবেষণাটি ভাষার বিশুদ্ধতা ও অনুবাদের বিশ্বস্ততা রক্ষার একটি ক্ষুদ্র প্রয়াস। গঠনমূলক আলোচনা ও মতামত সাদরে আমন্ত্রিত।”