রসমভিত্তিক প্রি-গ্রামাটিক্যাল কোর-সেমান্টিক পদ্ধতি

"আরবি ভাষা ও কুরআনের শব্দার্থ বিশ্লেষণের একটি গবেষণা-প্রস্তাব"

ধাপ ২. ব্যাকরণের বন্দিত্ব ও কুরআনিক দর্শনের সংকোচন

ভূমিকা

প্রথম ধাপে দেখা গেছে যে, কুরআনের প্রাথমিক লিখিত রূপ ছিল রসমভিত্তিক, যেখানে নুকতা ও হারাকাত অনুপস্থিত ছিল। এর ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে— সেই সময় ভাষাভাষীরা কীভাবে শব্দের অর্থ নির্ধারণ করতেন?

প্রাথমিক আরবিতে শব্দ বোঝার একটি ব্যাকরণ-পূর্ব (Pre-grammatical) অর্থস্তর বিদ্যমান ছিল। অর্থাৎ, অর্থ নির্ধারণের প্রধান ভিত্তি ছিল শব্দের গঠন, পারস্পরিক সম্পর্ক এবং ব্যবহারিক প্রেক্ষাপট; পরবর্তীকালের আনুষ্ঠানিক ব্যাকরণ নয়। এই আলোচনার উদ্দেশ্য প্রাচীন ইতিহাস বা ব্যাকরণকে বাতিল করা নয়, বরং কুরআনের পাঠকে তাদের উপর নির্ভরশীল হওয়া থেকে মুক্ত করা। কারণ কুরআন নিজেকে সর্বমানুষের জন্য প্রেরিত বার্তা হিসেবে উপস্থাপন করে (যেমন ৬:১৯)।

যদি কুরআনের কোনো শব্দের অর্থ নির্ধারণ করতে আমাদের বহিরাগত কাঠামোর সাহায্য লাগে, তাহলে সেই শব্দের কুরআনিক সার্বজনীনতা প্রশ্নের মুখে পড়ে। বিদ্যমান প্রাচীন পাণ্ডুলিপি, লিপিগত বৈশিষ্ট্য এবং ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ইঙ্গিত করে যে কুরআনিক ভাষার একটি সম্ভাব্য ব্যাকরণ-পূর্ব সেমান্টিক স্তরের অস্তিত্বের দিকে নির্দেশ করে, যা পরবর্তীকালে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাকরণ দ্বারা আংশিকভাবে আচ্ছাদিত হয়ে থাকতে পারে এবং মূল দর্শনকে সংকীর্ণ করেছে। আর এই সম্ভাবনাই বর্তমান গবেষণায় পরীক্ষা করা হচ্ছে।

কুফা ও বাসরা স্কুলে ব্যাকরণ সুসংগঠিত হওয়ার পর কুরআনের পাঠ ও ব্যাখ্যায় সেই ব্যাকরণিক কাঠামোর প্রভাব ক্রমশ বৃদ্ধি পায়। এই গবেষণার আলোকে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, কুরআনের ভাষা বোঝার ক্ষেত্রে ব্যাকরণ কি মূল পাঠের অনুসারী ছিল, নাকি পরবর্তী সময়ে পাঠ ব্যাখ্যার প্রধান কাঠামোতে পরিণত হয়েছিল। যেখানে গ্রন্থ থেকে ব্যাকরণ আসার কথা, সেখানে ব্যাকরণ দিয়ে গ্রন্থ ব্যাখ্যা করা হয়েছে। আমার গবেষণার আলোকে মনে হয়, পরবর্তী ব্যাকরণিক কাঠামো কুরআনের কিছু ধারণাকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করার প্রবণতা সৃষ্টি করেছে। এই সম্ভাবনাটি আরও গবেষণার দাবি রাখে। যদি এই প্রস্তাবটি পরীক্ষায় সমর্থিত হয়, তাহলে কুরআনের কিছু মূল ধারণা পরবর্তী ঐতিহ্যে আচারকেন্দ্রিক ব্যাখ্যার দিকে সরে গেছে, দর্শন হারিয়েছে এবং 'দ্বীন'-এর মতো ধারণাগুলোকে ভিন্ন অর্থে (ধর্ম) বোঝার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এমন একটি ব্যাখ্যা (ব্যাকরণকে কুরআনিক অর্থের একমাত্র উৎস হিসেবে নয়) বিবেচনার প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়েছে।

বাসরা স্কুল ব্যাকরণের সূচনা ও ঐতিহাসিক ভিত্তি

অ্যারাবিক ব্যাকরণের প্রথম সিস্টেম্যাটিক এ যাওয়ার সূচনাকে সাধারণ ভাষাতাত্ত্বিক ঐতিহাসিক গবেষণায় বাসরা স্কুল ভিত্তিক হিসেবেই গণ্য করা হয়। আবু আল-আসওয়াদ আল-দুয়ালি (সীরাকে’ব পরবর্তী প্রজন্ম) নামে এক তাবি‘উন যুগে, ব্যাকরণ ও ভাষাবিজ্ঞান নিয়ে লিখা শুরু করেন এবং স্বরচিহ্ন (diacritics) সংযোজনসহ ভাষা বিশ্লেষণের কিছু মৌলিক ধারণা তৈরি করেন।

তিনি শব্দের শ্রেণি (isim, fi‘l, harf) চিহ্নিত করার পদ্ধতি প্রথম প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরে পূর্ণ ব্যাকরণে রূপ নেয়। তাকে অনেক ঐতিহাসিক উৎস “আরবি ব্যাকরণের পিতা” বলে উল্লেখ করেছে। এসব কাজ শুরু হয় ৭ম শতাব্দীর শেষভাগ থেকে ৮ম শতাব্দীর শুরুর দিকে। বাসরা শহরই সেই সময় ব্যাকরণ ও ভাষাতত্ত্বের প্রথম বড় কেন্দ্র হয়ে ওঠে। এটাই আরবি ব্যাকরণের সিস্টেম্যাটিক যাত্রার সূচনা। বাসরা স্কুলের পরে আরও ব্যাকরণিকদের প্রাপ্তি ও কাজগুলো দেখায় যে এই ব্যাকরণিক প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে ব্যাপক, সংকীর্ণ ও নিয়মিত রূপ নিল, যা পরবর্তী সময়ে বিশাল গ্রন্থ, নিয়ম, শ্রেণীবিন্যাসে পরিণত হয়।

কুফা স্কুল ব্যাকরণের সূচনা ও ঐতিহাসিক ভিত্তি

বাসরা স্কুলের কাজ চালিয়ে তখনই কুফা শহরেও একই প্রক্রিয়া শুরু হয়। Grammarians of Kufa হিসেবে পরিচিত ঐ স্কুল মূলত ৮ম শতাব্দীতে উঠে আসে। এর প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে Al-Ru‘asi নামক ব্যাকরণিককে স্মরণ করা হয়, এবং পরবর্তী grammarians এই কুফা ধারাকে আরও বিস্তৃত করেন।

কুফা ও বাসরা দুটি স্কুলের মধ্যে বিরোধও ছিল। কোথাও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণের units-এর উপর মতানৈক্য, কোথাও analogy vs precedent-এর দাওয়াই। এগুলো পরবর্তীতে ব্যাকরণের নিয়ম, শ্রেণী, বিপরীতধারার সৃষ্টি করে। কুফা স্কুলের ব্যাকরণিকরা নিজ নিজ নিয়ম ও বিশ্লেষণে কাজ করেন এবং দুই ধারার মধ্যে বর্ণগত পার্থক্য বেশি স্পষ্ট হয়।

এখন প্রমাণসাপেক্ষে এটা বলা যায়, কুরআন নাযিলের সময়ের ভাষা ও পরবর্তী ব্যাকরণের সময়ের ভাষা দুটি আলাদা যুগে স্থির হয়েছে। এটা ইতিহাসের নির্ভরযোগ্য পর্যালোচনার উপর দাঁড়ায়। এখানে না কোনো কল্পনা, না কোনো মতবাদ।

গবেষণার লক্ষ্য

পরীক্ষা করে দেখা উচিত যে, কুরআনের শব্দসমূহের মধ্যে একটি স্থিতিশীল ধারণাগত কোর বিদ্যমান কি না, যা বিভিন্ন আয়াতে ধারাবাহিকভাবে অনুসরণ করা সম্ভব। তাই শব্দার্থ নির্ধারণে কেবল ব্যাকরণ নয়, শব্দের গঠন, রসম এবং কুরআনের অভ্যন্তরীণ ব্যবহারও সমান গুরুত্বের দাবিদার। অর্থাৎ, ব্যাকরণকে কুরআনিক অর্থের একমাত্র উৎস হিসেবে নয়; বরং একটি পরবর্তী বিশ্লেষণী কাঠামো হিসেবে বিবেচনা করার প্রস্তাব এখানে উপস্থাপন করা হয়েছে।